ইবনে খালদুনের রাষ্ট্র ও সমাজভাবনা



ইবনে খালদুনের রাষ্ট্র ও সমাজভাবনা

দুটো উদ্ধৃতি দিয়ে শুরু করি; একটি খোদ ইবনে খালদুনেরই, অন্যটি পত্রিকার বরাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগানের। ১৯৮১ সালে রিগান সাহেব ‘সাপ্লাই সাইড ইকনমিক্স’- এর তত্ত্ব উপস্থাপনকালে ইবনে খালদুনকে কেবল স্মরণই করেন নি, বরং তার তত্ত্বের স্বপক্ষেও খালদুনকে হাজির করেন। নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর শিরোনাম, ‘রিগান ইসলামিক পণ্ডিতকে উদ্ধৃত করেছেন’, দেখেই আন্দাজ করা যাচ্ছে পশ্চিমা মিডিয়া খুব গুরুত্বসহকারে খালদুনকে উদ্ধৃত করার ঘটনাটা প্রকাশ করেছিল। আবার, প্রথমেই খালদুনের যে উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে সেটার ব্যবহার আমরা বাংলাদেশের প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী ও গবেষক নুরুল কবীরের সাম্প্রতিক (২০২০)  বইতে দেখতে পাই। তিনি ইবনে খালদুনের এই উদ্ধৃতি ও হাওয়ার্ড জিনের একটা উদ্ধৃতি দিয়ে উনষত্ত্বরের গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস লেখা শুরু করেন। পাঠকমাত্রই খেয়াল করবেন, রিগান সাহেবের নিওলিবারেলিজম বা নয়া-উদারনীতিবাদের অন্যতম হুজুর হিসাবে খ্যাতি রয়েছে, অন্যদিকে নুরুল কবীর বামপন্থি ও এন্টি-এস্টাবলিশমেন্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচত। কিন্তু, বিপরীতধর্মী দুজন ব্যক্তিত্ব ভিন্ন ভিন্ন সময়ে তাদের গবেষণা ও তত্ত্বের শুরুতেই নাম নিচ্ছেন একই ব্যক্তির; আবার একজন নিচ্ছেন অর্থনীতির সাথে জড়িয়ে, অন্যজন নিচ্ছেন ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে। ইবনে খালদুনের চিন্তা, কাজ ও প্রভাবের বিচিত্র গতিপথ সম্পর্কে কিছুটা আন্দাজ এতেই পাওয়া যায়। একজন খালদুন বিশেষজ্ঞ তো বলেই ফেলেন, ইবনে খালদুন যে একেকজনের কাছে একেকরকম ব্যাখ্যা নিয়ে হাজির হন এটা আসলে যেমন তাঁর মহত্বের পরিমাপক, তেমনি তাঁর দ্ব্যর্থতা বা অস্পষ্টতারও পরিমাপক।

পশ্চিমা একাডেমিয়াতে বিভিন্ন কারণেই ইবনে খালদুন ব্যাপক চর্চিত হয়েছেন; অরিয়েন্টালিস্ট বা প্রাচ্যবাদী চর্চার সাথে ইবনে খালদুনের নাম এতো ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে যে খালদুন গবেষক রবার্ট আরউইন তার বইয়ের ভূমিকায় মন্তব্য করেন, কেউ যদি উনিশ শতকের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ইউরোপের জ্ঞানজগতে কেবল খালদুনের উপর জিনিসপাতি তালাশ করেন, তাহলে তিনি অরিয়েন্টালিজম বা প্রাচ্যবাদের অর্ধেক ইতিহাসই জেনে যাবেন।

ইউরোপের একেকস্থানে তাকে একেকরকম ভাবে পাঠ করা হয়েছে। যেমন, দীর্ঘদিন ধরে ইবনে খালদুনের উপর বেশিরভাগ কাজ ফরাসিরাই করেছিলেন, তার কারণও স্পষ্ট : উপনিবেশায়ন। উপনিবেশের অংশ হিসাবে ফ্রান্সে ইবনে খালদুনকে চর্চার প্রায় একটা হিড়িক পড়েছিল। অনুবাদ প্রক্রিয়ার হাত ধরে ইবনে খালদুনের বয়ানকে ফরাসি উপনিবেশকরা নিজেদের ঔপনিবেশিক বায়নের মধ্যে আত্তীকৃত করেছিলেন। একাডেমিয়ার জগতের অনেকেই দাবি করেছিলেন, খালদুন প্রাচ্যবাদের ফসল ছিলেন, এবং তাঁর প্রতি প্রাচ্যবাদীদের যে আগ্রহ ছিল তা থেকে বিচ্ছিন্ন করে তাকে কতটা মূল্যায়ন করা যাবে সেটাও নিশ্চিত না। অবশ্যই, উপনিবেশিত জনগণের ইতিহাস-আচার-আচরণ জানা ও শাসন উপযুক্ত নয়া বয়ান তৈরির জন্য উপনিবেশকের যে তাগিদ তাতে ইবনে খালদুন ও তাঁর টেক্সট খুব গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হাজির করেছিল।

অন্যদিকে উপনিবেশায়নের কারণে ফ্রান্সে যে তরিকায় খালদুন ব্যবহৃত হয়েছেন সেভাবে জার্মান, ইংল্যান্ড বা আমেরিকাতে ঘটেনি; কিন্তু ফরাসী ভাষাতেই খালদুন বেশ আগ থেকে এবং ব্যাপকভাবে চর্চিত হওয়ার কারণে বাদবাকীরাও ফরাসী পাঠ দ্বারা কমবেশি প্রভাবিত ছিলেন। পোলিশ সমাজবিজ্ঞানী লুডভিগ গুমপ্লোভিচ এবং জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ফ্রাঞ্জ অপেনহেইমার খালদুনকে সমাজতাত্ত্বিক হিসাবে পাঠ করেছিলেন। বহু পশ্চিমা পণ্ডিতই খালদুনকে সমাজবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। সমাজবিজ্ঞানী আর্নেস্ট গেলনার মুকাদ্দিমায় প্রস্তাবিত তাত্ত্বিক মডেলের সাথে বিভিন্ন পশ্চিমা দার্শনিক ও সমাজবিজ্ঞানীর চিন্তার যোগসূত্র তৈরি করেন। আবার ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ আর্নল্ড টয়েনবি খালদুনের উচ্চকিত প্রশংসা করতেন। তিনি যখন অ্যা স্টাডি অফ হিস্টোরি-তে বিভিন্ন সভ্যতার উত্থান পতনের কারণ তালাশ করছিলেন, তখন তিনি এই সিলসিলার পূর্বসূরীদের খোঁজ করছিলেন, যারা কিনা তাকে তার উচ্চবিলাসী প্রকল্পের বৈধতা দিতে পারেন। খালদুন ও মুকাদ্দিমা খুঁজে পেয়ে টয়েনবি পুলকিত হয়েছিলেন। 

মন্তব্যসমূহ