মানবসম্পদ উন্নয়নে শিক্ষা, বিনিয়োগ ও সরকারের দায়


মানবসম্পদ উন্নয়নে শিক্ষা, বিনিয়োগ ও সরকারের দায়

কিন্তু একথা বলার অপেক্ষা রাখে না আমাদের নীতি নির্ধারকরা যদি কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসনে যথাযথ ও উপযুক্ত পরিকল্পনা নিতেন ও বাস্তবায়নে সৎ ও আন্তরিক থাকতেন তাহলে দেশ আরও অগ্রসর হতো।

স্বাধীনতার পর সব সরকারই শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদেও সর্বজনীন ও অভিন্ন শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্বের কথা বলা হয়েছে। পিআরএসপি’র রিপোর্টও (২০০৮) বলা হয়েছে একবিংশ শতাব্দির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা ও প্রকৃত জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার জন্য প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চশিক্ষাকে ঢেলে সাজানোর কথা।
২০০৭ সালে প্রকাশিত ইউজিসি’র রিপোর্টেও মানবসম্পদ উন্নয়ন ও উচ্চশিক্ষার গুরুত্বের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে গুণগত পরিবর্তনের বিপরীতে শিক্ষাকে করা হয়েছে একটি বাণিজ্যিক পণ্য। বর্তমান সরকারও অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার সর্বজনীন সুযোগ ও মান নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। শিক্ষাখেত্রে সরকার ও নীতি নির্ধারকদের বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা ও নীতির অভাবে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন যেমন ব্যাহত হচ্ছে একই সাথে সমাজে অসন্তোষ, অস্থিরতা ও অনৈক্যও বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনিশ্চিত হচ্ছে লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী-অবিভাবকের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ অধিকার, স্বপ্ন ও জীবন।

মানবসম্পদ ও মানবপুঁজির তত্ত্ব (Human Capital Theory) আজ বিশ্ব অর্থনীতির পাঠ্য ও স্বীকৃত বিষয়। এশিয়া, আফ্রিকা, আমেরিকার বিভিন্ন দেশে চমকপ্রদ অনেক গবেষণায় প্রমানিত হয়েছে শিক্ষার সাথে উন্নয়নের সম্পর্ক। এ মহতী কাজের জন্য আর্থার সোল্‌জ, গ্রে বেকার, এম ফ্রিডম্যান, অমর্ত্য সেনসহ অনেকে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। তার আলোকে এই নিবন্ধে শিক্ষায় বিনিয়োগ ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের সম্পর্কে কিছুটা আলোচনার প্রয়াস।  
 
 
শিক্ষা, মানবসম্পদ ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন 
আধুনিক বিশ্বে শিক্ষা একটি স্বীকৃত বিষয়, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দ্যেশ্য অর্জনের একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়া। যদিও শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ভর করে সমাজের বহুমাত্রিক ভাবাদর্শের উপর। শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল অর্থ উপার্জন না ব্যক্তির চরিত্রের বিকাশ, তা এখনও অনেকের বিতর্কের বিষয়। এটাই স্বাভাবিক, সমাজে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও মতাদর্শের মানুষ থাকার কারণে শিক্ষার অর্থ এবং সংজ্ঞায় থাকবে নানা বৈচিত্র্য। চলমান এই বিতর্কের সহজে অবসান না হলেও, এটা নানাভাবে প্রমাণিত যে, শিক্ষা এবং উন্নয়নের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য ও অঙ্গাঙ্গী।
১৯৯৯ সালে অমর্ত্য সেন তার এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, “যে কোনো ধরনের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা হচ্ছে অন্যতম প্রধান বিষয়/শর্ত.. যেমন, অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে জাপানের আবির্ভাবের পূর্বে তাদের শিক্ষার হার ও মান ছিল অতি উঁচু। ” সঙ্গতই বলা যায় শিক্ষায় প্রয়োজনীয় ও পরিকল্পিত বিনিয়োগ একটি জাতির অবস্থা কিভাবে পাল্টে দেয় তার একটি সফল গল্প হচ্ছে আমাদের এশিয়ার দেশ জাপান। বহু আগে জাপান শিক্ষাকে বিশাল পুঁজিতে রুপান্তরিত করেছে। শতভাগ শিক্ষিত জাপানিদের অর্থনৈতিক সম্পদের মধ্যে ১ শতাংশ প্রাকৃতিক পুঁজি, ১৪ শতাংশ ভৌত বা বস্তুগত পুঁজি এবং ৮৫ শতাংশ শিক্ষা সংক্রান্ত মানবিক ও সামাজিক পুঁজি।

শিক্ষায় বিনিয়োগে Rate of Return অধিক। শিক্ষিত শ্রমশক্তির আয় অধিক হয় বিধায় সব অবিভাবকই তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠান। বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশের উপর গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি বছর প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক শিক্ষার Rate of Return ১৮ শতাংশ বা তার উপর।   মালয়েশিয়ায় এক গবেষণায় দেখা গেছে, এক বছরের বাড়তি শিক্ষায় একজন কৃষক ২ থেকে ৫ গুণ কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করতে পারেন। কারণ অধিকতর শিক্ষায় কৃষকদের দৃষ্টিভঙ্গী উন্নত হওয়ার কারণে তারা সৃজনশীল হয়, নতুন পদ্ধতির প্রতি আগ্রহী হয়। ৪ বছরের অধিক শিক্ষিতরা কৃষিক্ষেত্রে সার ও প্রযুক্তি ব্যবহারে তুলনামূলকভাবে বেশি আগ্রহী হন যারা ১ থেকে ৩ বছর পর্যন্ত শিক্ষা নিয়েছে তাদের থেকে।   

শিক্ষায় বিনিয়োগের কারণে ব্যক্তি, সমাজ ও সমগ্র বিশ্ব লাভবান হয়। মোটকথা শিক্ষা হচ্ছে দারিদ্র্য বিমোচনের সবচেয়ে শক্তিশালী উপকরণ ও হাতিয়ার। বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিক নোবেল বিজয়ী থিওডর ডব্লিউ সোলজ “মানবপুঁজির” ধারণাকে পরিচিত করেন এবং এই তত্ত্বের সম্প্রসারণ ঘটান আরেক নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিক গ্রে বেকার। তাদের মতে ব্যক্তির অর্জিত দক্ষতা এবং জ্ঞান শ্রমবাজারে তাদের মূল্য বৃদ্ধি করে। শিক্ষায় বিনিয়োগের অনেক পরোক্ষ ইতিবাচক (positive externalities or spillover benefit/effects) উপকার ও প্রভাব আছে। যেগুলোকে আমরা ভোগ করতে পারি এবং নানাভাবে এ থেকে লাভবান হতে পারি। নোবেল বিজয়ি ধ্রুপদী অর্থনীতিক মিল্টন ফ্রিডম্যান ১৯৬২ সালে শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু Spillover Effects এর ব্যাখ্যা করেছেন। তার মতে, নাগরিকদের একটি বৃহৎ অংশের মধ্যে কিছু অভিন্ন ন্যূনতম শিক্ষা, জ্ঞান ও মূল্যবোধ ব্যতিরেকে একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক সমাজ গড়া অসম্ভব, শিক্ষা সেই কাজটি করে থাকে। একে কেবল অর্থনীতির চালিকা হিসেবে নয়; বৃহত্তর বিবেচনায় তা নৈতিকতা, মানবতা, দক্ষতা, সামর্থ্যের গুণাবলিও অর্জনের কারণ (রহমানঃ ২০০২)।     

মন্তব্যসমূহ